আজ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিমান ও দ্রোহী চেতনার লেখক মহাত্মা আহমদ ছফার জন্মদিন। তাঁকে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-নজরুলের পর বেহতর মেধাবী ও প্রথা বিরোধী লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। গত এক’শ বছরের মধ্যে যে দশজন লেখক সবচেয়ে শক্তিমান ও মৌলিক লেখক বলে স্বীকৃত আহমদ ছফা তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
বাংলা সাহিত্যে আহমদ ছফার ব্যতিক্রমি অবদান হলো, তিনি বাংলা ভাষাকে রবীন্দ্র-নজরুল প্রভাব থেকে হেঁচকা টান মেরে বের করে এনেছেন এবং উত্তরাধুনিক চিন্তকদের চিন্তার খোরাক হিসেবে তাঁদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্য আন্তর্জাতিক যেকোনো ভাষার সাথে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম তার প্রমাণ হাজির করেছেন।
আহমদ ছফা এমন একজন প্রতিভাধর লেখক যিনি সাহিত্যর জন্য আমৃত্যু স্পর্ধীত জীবন কাটিয়েছেন। চাটগাঁর মত এলাকার হয়েও তিনি ঢাকায় সাহিত্যের হিরোদের জীবন যাপন করতেন। ঢাকায় চট্টগ্রামের লেখকদের জন্য তিনি ছায়া হিসেবে গণ্য হতেন। তাঁর সমকালীন এবং পরের প্রজন্মের এমন কোনো কবি লেখক বাকি নেই যাদের তিনি প্রণোদনা দেননি, আশ্রয় দেননি। কোন্ লেখক কোথায় আছেন, কোথায় থাকছেন, কিভাবে খাচ্ছেন নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন। সাহিত্য যদি মানবিক ও নান্দনিক চর্চার সোপান হয়, আহমদ ছফা ছিলেন সেই সোপানের নাবিক।
গুরু আহমদ ছফার অপার ভাগ্য যে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় দেশ বিদেশের খ্যাতিমান লেখকদের মনোযোগ কাঁড়তে পেরেছিলেন। তাঁর বাসা ছিল নবীণ প্রবীণ লেখকদের আড্ডাস্থল। ফলে তাঁকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের কেউই আহমদ ছফাকে ভুলেননি। ফলে একদল শক্তিশালী লেখক তাঁকে গুরু হিসেবে সন্মোধন শুরু করে। যে দলের মধ্যে ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খানের মতো প্রতীথযশা লেখকরা আছেন।
আমি নিজেকে আহমদ ছফার ভাবশীষ্য ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ আমার গুরু হওয়ার জন্য যতগুলো অনুষঙ্গ বিদ্যমান ছফার মধ্যে তার সবগুলো হাজির ছিল। বাস্তবতা হলো আমি আহমদ ছফাকে কখনো স্বচক্ষে দেখিনি, তাঁর সরাসরি সান্নিধ্যে পাইনি। আমি আমার মনের মতো এমন একজন গুরুর খোঁজ করছিলাম যিনি আমাকে তাঁর গুণাবলী দিয়ে মুগ্ধ করতে পারবেন। মুগ্ধ হওয়ার মতো সমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আহমদ ছফার মধ্যে বিদ্যমান থাকায় তিনি অবচেতন মনে আমার শুরুতে পরিণত হয়েছিলেন। যদ্যপী তিনি আমার গুরু আছেন, আমি তাঁর ভাবশীষ্য।
আহমদ ছফাকে নিয়ে আমার চর্চার কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। তাঁকে আমি পাঠ করেছি ধর্মগ্রন্থের মতো। তাঁর নয় খণ্ড রচনাবলি পড়েছি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে, একবার নয় বহুবার শেষ করেছি। রচনাবলির কোন খণ্ডে কি আছে পৃষ্ঠাসহ বলে দেয়ার ক্ষমতা রাখি। তাঁর প্রত্যেকটি লেখা কালোত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি কোথায় কি বলেছেন রেফারেন্স টানতে পারি। এ পর্যন্ত যত লেখকের লেখা পড়েছি পাশ্চাত্য দর্শনের পর আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে ছফার লেখা। এতো বেশি আন্দোলিত অন্য লেখকের লেখা পড়ে হইনি। তিনি বাঙালির মানস চেতনাকে যেভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তা অন্য কোনো লেখকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁর লেখায় বাঙালিকে নিয়ে যেমন আক্ষেপ আছে তেমনি আছে সম্ভাবনার উদাত্ত বয়ান। তিনি নিজের জাতিকে নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন, সমস্যা নিয়ে যারপরনাই চিন্তা ভাবনা করেছেন এবং কিভাবে বাঙালির মুক্তি সম্ভব তার দিশাও হাজির করেছেন।
আমার ভাগ্য এতো ভালো যে আমিই কক্সবাজারে সর্বপ্রথম তরুণ লেখকদের মধ্যে আহমদ ছফাকে পরিচিত করতে পেরেছিলাম। আহমদ ছফার কীর্তি ও বীরত্বকে তাদের মাঝে চারিয়ে দিতে পেরেছিলাম। আহমদ ছফাকে নিয়ে ধারাবাহিক নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন করতাম। তাঁর জন্ম-মৃত্যু্র দিন ঘটা করে পালন করতাম, যেখানে কক্সবাজারের বরেণ্য লেখকরা নিয়মিত উপস্থিত থাকত। গত দুই বছর আগে তাঁকে নিয়ে একাধারে সাত দিনের বিষয় ভিত্তিক পাঠচক্রের আয়োজন চলে, পাঠচক্রে তাঁর যতগুলো গ্রন্থ আছে তার উপর গুরুগম্ভীর আলোচনা হয়, উপস্থাপন করা হয় লিখিত প্রবন্ধ।
আজ দেশের চরম দূর্দিনে আহমদ ছফার মতো একজন স্পষ্ঠভাষী লেখক-বুদ্ধিজীবীর খুবই দরকার ছিল, যিনি রাষ্ট্র্রের তাঁবেদারি করতেন না কিন্তু রাষ্ট্র্রকে নির্দেশনা দিলে রাষ্ট্র্র তাঁর পরামর্শ শুনত। আজ লেখক আছে, বুদ্ধিজীবী আছে, কিন্তু রাষ্ট্র্রকে প্রভাবিত করার মতো কোনো মানবিক মানুষ নেই। সবাই যার যার আখের গোছাতে ব্যস্ত। দেশের কথা চিন্তার করার ফুরসত কই!
লেখক: হাসান মুরাদ সিদ্দিকী





