চট্টগ্রামের রাউজানের জসিম উদ্দিন আবাসন-সাম্রাজ্য গড়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে। একসময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে গাড়ির পুরোনো যন্ত্রাংশের ব্যবসা করতেন। এরপর জমি কেনা শুরু করেন। ভবন বানিয়ে বিক্রি করেন অভিজাত ক্রেতাদের কাছে, যাঁদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি ক্রেতা।
আজমানে জসিমের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের অফিস থেকে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটির নাম পাওয়া গেছে সেখানকার সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যালয়ে। প্রবাসীদের কাছে জসিম সম্পর্কে বেশি তথ্য নেই। তবে হঠাৎ করে আবাসন খাতে তাঁর বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগের জন্য জসিম বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর কোনো অনুমোদন নিয়েছেন, এমন তথ্য নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। তবে আলোচনা আছে, বাংলাদেশি প্রভাবশালীদের কেউ কেউ তাঁর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের জমিতে লগ্নি করেছেন। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অভিবাসনের নীতি অনুযায়ী সাড়ে ছয় কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে ১০ বছরের নবায়নযোগ্য রেসিডেন্স পারমিট (বসবাসের অনুমতি) পাওয়া যায়। বিনিয়োগকারীর তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখে আরব আমিরাত।
মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক শহরগুলোতে বাংলাদেশিদের জমি-ফ্ল্যাট ক্রয়ের প্রবণতা আগে থেকেও ছিল, ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নীতির পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
আজমান ও দুবাই
আজমানে জসিমের বিনিয়োগ সম্পর্কে খোঁজ পাওয়া যায় দুই বছর আগে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চট্টগ্রামের রাউজানে খোঁজ নিয়ে জসিম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা গেছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজ্য আজমানের শিল্প এলাকায় একটি সড়ক ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ল সারি সারি সুদৃশ্য বাড়ি। গুনে দেখলাম ২৬টি বাড়ি, একই নকশার। সঙ্গী দুই প্রবাসীকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। অনেক বাড়ির সামনে ভাড়া বা বিক্রির সাইনবোর্ড ঝোলানো। একটি বাড়ির সামনে চোখ পড়ল ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের সাইনবোর্ড। এই কার্যালয়ে ওবায়দুর নামে পরিচয় দেওয়া এক কর্মী জানালেন, ‘আমাদের স্যার বাংলাদেশি। চট্টগ্রামের রাউজানের জসিম স্যার এটার মালিক।’
আজমানের শিল্প এলাকার সড়ক ধরে যেতে যেতে যেসব বাড়ি চোখে পড়েছিল, সেগুলোর সামনে নাম লেখা জেআর রেসিডেন্স। ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের কার্যালয়ে আমাদের দেখানো হলো জেআর রেসিডেন্সের বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাটের ‘ক্যাটালগ’। ভবনগুলোতে রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। আশপাশে ভালো স্কুল, বিপণিবিতান থাকার কথাও জানালেন ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের কর্মকর্তারা। তাঁরা বললেন, অনেক বাংলাদেশি সেখানে ফ্ল্যাট কিনেছেন।
আজমানে ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের আরও কয়েকটি ভবন রয়েছে। ওই এলাকায় খাবারের হোম ডেলিভারি (বাসায় পৌঁছে দেন) করার কাজ করা এক বাংলাদেশি বললেন, এসব বাড়ি বাংলাদেশের জসিমের। এতগুলো বাড়ির কারণে এলাকাটি মুখে মুখে ওনার নামে নামকরণ হয়ে গেছে।
৫ থেকে ৯ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট
২৬টি ভবনে ঠিক কয়টি ফ্ল্যাট আছে, তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে জেআর রেসিডেন্স-৯ ও ১০ এর ক্যাটালগে প্রতিটি ভবনে ২০টি করে ফ্ল্যাটের নমুনা ছিল। আজমানে সম্পদ কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করে জানা যায়, জেআর রেসিডেন্সের ফ্ল্যাট বিক্রি করা হচ্ছে ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ দিরহামে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ থেকে ৯ কোটি টাকার কাছাকাছি।
আজমান ও দুবাইয়ের একাধিক প্রবাসী ব্যবসায়ী বললেন, জসিম উদ্দিন একসময় গাড়ির পুরোনো যন্ত্রাংশের ব্যবসা করতেন। পরে তিনি বাংলাদেশে সোনা পাঠানোর অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে চট্টগ্রামের একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালের দিকে হঠাৎ করেই তিনি আজমানের আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগ করেন। পরে আজমান ও দুবাইয়ের আরও অনেক এলাকায় জমি কিনেছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন ইউনুছ গ্রুপ।
আজমানের একটি সরকারি অফিস থেকে পাওয়া রিয়েল এস্টেট মালিকদের একটি তালিকায় রয়েছে ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের নাম। যার মালিক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ও মোহাম্মদ ইউনুছ। তাদের এজেন্ট নম্বর ২৯৭৮।
ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের ওয়েবসাইটে বলা আছে, জেআর কন্ট্রাকটিং নামেও তাদের প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ভবন নির্মাণ করে থাকে। তাদের কার্যালয়ও ইউনুছ রিয়েল এস্টেটের ভবনে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুবাইয়ের একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বলেন, ২০১৯ সালের পর হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠেন জসিম।
সূত্র: প্রথম আলো





