বাংলাদেশের মানুষ বহুদিন ধরে এক অন্ধকার রাজনীতির শিকার। কখনো একদলীয় ফ্যাসিবাদ, কখনো গুম-খুন, আবার কখনো পাড়া-মহল্লায় চাঁদাবাজির আতঙ্ক। জনগণের রক্ত ও ঘামের উপর দাঁড়িয়ে এই দেশে কিছু শক্তি বারবার তাদের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে—জনগণ আর ভয় পায় না।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছিল ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে। বছরের পর বছর দমননীতি, গণতন্ত্র হত্যা, গুম-খুন আর নির্বাচনী কারসাজির জাল ভেঙে রাস্তায় নেমেছিল সাধারণ মানুষ। রক্ত ঝরেছে, প্রাণ গেছে, কিন্তু ফ্যাসিস্ট একদলীয় শাসনের শিকল ছিঁড়ে গেছে। এখন সামনে সুযোগ—সত্যিকারের গণতন্ত্র গড়ার।
একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই বোঝা যায়, যখন মানুষ ভয়হীনভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু এ দেশে নিজের মত প্রকাশ করায় প্রাণ দিতে হয়েছে আবরার ফাহাদের মতো তরুণকে। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছিল শুধুমাত্র ভিন্নমত প্রকাশের জন্য। এ ঘটনা শুধু একজন ছাত্রের মৃত্যু নয়—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গলায় চাপানো ফাঁসির দড়ির প্রতীক।
ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক নির্মম উদাহরণ। এরপর কত পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে—কোনো খোঁজ নেই, কোনো বিচার নেই। রাষ্ট্র যখন নিজেই নাগরিককে তুলে নিয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র মৃত হয়ে যায়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গুম এক অমোচনীয় কলঙ্ক।
আজ যখন দেশ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, তখনো দেখা যাচ্ছে ভয় ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি। পাড়া-মহল্লায় কিছু রাজনৈতিক মুখোশধারী গোষ্ঠী জনগণকে জিম্মি করে রেখেছে। তারা ক্ষমতায় নেই, কিন্তু চাঁদা আদায়, দখলবাজি আর সন্ত্রাস চালিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কে রেখেছে। দোকানদার থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা—কেউ রেহাই পাচ্ছে না। এই ভয়ের রাজনীতি শুধু অর্থনৈতিকভাবে জনগণকে জিম্মি করছে না, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি করছে।
তাদের আচরণ প্রমাণ করছে তারা ভয় দেখিয়ে টিকে থাকতে চাইছে। এই সংস্কৃতিকে এখনই নির্মূল করতে না পারলে আবারও সন্ত্রাসী রাজনীতির অন্ধকারে দেশ ডুবে যাবে।
তরুণরা আজ নতুন বাংলাদেশ চায়—একটি বাংলাদেশ যেখানে মত প্রকাশ করতে গিয়ে কেউ মরবে না, যেখানে পরিবারকে বছরের পর বছর গুমের দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়াতে হবে না, যেখানে পাড়ার দোকানদারকে প্রতিদিন চাঁদার খাতায় নাম লেখাতে হবে না। তরুণ প্রজন্মের হাতে আছে প্রযুক্তি, জ্ঞান, উদ্ভাবনশক্তি—এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভয়হীন গণতন্ত্র গড়ে তোলাই হবে নতুন বাংলাদেশের পথ।
জনগণ চায় একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ।
আবরার ফাহাদের রক্ত, ইলিয়াস আলীর গুম, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের শেখায়—ভয়ের রাজনীতি চিরস্থায়ী নয়। যত শক্তিই হোক, জনগণের ইচ্ছাকে দমন করা যায় না।
নতুন বাংলাদেশ মানে হবে ভয়হীন বাংলাদেশ। যেখানে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকবে না, গণতন্ত্র হবে সত্যিকার অর্থেই জনগণের। আর সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।





