ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে শান্তি আলোচনায় বসতে চায় কিয়েভ। এ লক্ষ্যে মস্কোকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ক্রেমলিন জানাচ্ছে—রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তবে প্রথম শর্ত রাশিয়ার নিজস্ব যুদ্ধলক্ষ্য পূরণ।
শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে “সবকিছু করতে হবে” এবং রাশিয়াকে আর “সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়িয়ে” চলা যাবে না। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে শান্তি আলোচনায় বসার প্রস্তাব মস্কোকে পাঠিয়েছেন ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুস্তম উমেরভ (বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান)। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতি, এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক চাপ—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়সীমা-নির্ধারিত উদ্যোগ—কিয়েভকে আলোচনার পথে নতুন ধাক্কা দিয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে; প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে লড়াই চলমান। এই সময়ে উভয় পক্ষের বিস্তর প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত পাঁচ মাসে ট্রাম্পের তৎপরতায় তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দুই দফা আলোচনা বসেছিল মস্কো ও কিয়েভের প্রতিনিধিদলের মধ্যে। সেখানে বন্দিবিনিময় ইস্যুতে ঐকমত্য হলেও যুদ্ধ বন্ধে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঐ আলোচনা গুলোতে ইউক্রেনীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন রুস্তম উমেরভ—যিনি সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান করা হয়েছেন; ফলে শান্তি প্রক্রিয়ায় তার কূটনৈতিক ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ইউক্রেন যখন মস্কোকে আলোচনার আমন্ত্রণ পাঠাচ্ছে, তখনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিনকে ৫০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন—সময়সীমার মধ্যে অগ্রগতি না হলে রাশিয়ার ওপর আরও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। রাশিয়া ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বহু দেশের বহুমাত্রিক নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন “ইউক্রেন নিয়ে মীমাংসা যত দ্রুত সম্ভব শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করার আগ্রহ বহুবার জানিয়েছেন,” তবে এটিকে তিনি একটি “দীর্ঘ ও সহজ নয়” প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। পেসকভের ভাষায়, “প্রধান বিষয় হলো—আমাদের লক্ষ্য অর্জন। এই লক্ষ্যগুলো পরিষ্কার।” টেলিভিশন সাংবাদিক পাভেল জারুবিনের প্রশ্নে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা-হুমকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের মানুষ ট্রাম্পের ‘কঠোর’ ভাষায় অভ্যস্ত; তবে ট্রাম্প নিজেও শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টার কথা বলেছেন।
ইউক্রেনের ২০% ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে—এর মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়াও রয়েছে। যুদ্ধবিরতির জন্য মস্কোর শর্ত: কিয়েভকে রুশ দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারের আশা ত্যাগ করতে হবে এবং পশ্চিমা মিত্রদের দেওয়া সব ধরনের অস্ত্রসহায়তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ইউক্রেন এ দাবিগুলো মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার প্রচেষ্টার মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবইয়ানিন টেলিগ্রামে জানান—গত রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ইউক্রেনের ১৪২টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, এর মধ্যে ২৭টি মস্কো অঞ্চলে। বেসরকারি উড়োজাহাজ নজরদারি সংস্থা রোবাভিয়াস্তিয়ার তথ্যে দেখা যায়, ড্রোন হামলার প্রভাবে মস্কোর চারটি বড় বিমানবন্দর—শেরেমেতইয়েভো, ভনুকোভো, দোমোদেদোভো ও জুকোভস্কি—সেবায় বিঘ্নের মুখে পড়ে; ১৩৪টি ফ্লাইট ফিরিয়ে নিতে হয়। মস্কো সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত ভনুকোভো ও গ্রাবৎসেভো বিমানবন্দর বন্ধ ছিল।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স





